লাল-সবুজের ক্রিকেট ইতিহাসে এর চেয়ে রোমাঞ্চকর ও শিহরণ জাগানিয়া মুহূর্ত সম্ভবত আর আসেনি! ডারউইনের বাইশ গজে আজ কেবল একটি টেস্ট ম্যাচের ভাগ্যই নির্ধারিত হয়নি, বরং লেখা হয়েছে বাংলাদেশের ক্রিকেট-রূপকথার সবচেয়ে গৌরবোজ্জ্বল অধ্যায়। শক্তিশালী অস্ট্রেলিয়াকে তাদেরই মাটিতে রীতিমতো দাপট দেখিয়ে হারিয়েছে বাংলাদেশ।
টেস্ট র্যাঙ্কিংয়ের শীর্ষে থাকা অজিদের বিপক্ষে নয় নম্বর স্থানে থাকা টাইগারদের এই জয় বিশ্ব ক্রিকেটের জন্যই এক বিশাল চমক। এই জয়ে সিরিজে ১-০ ব্যবধানে এগিয়ে গেল বাংলাদেশ। যার অর্থ, এই টেস্ট সিরিজটি আর কোনোভাবেই হারছে না তারা।
২৩ বছর আগে এই ডারউইন ও কেয়ার্নসেই অস্ট্রেলিয়ার কাছে অসহায় আত্মসমর্পণ করেছিল বাংলাদেশ। দীর্ঘ দুই দশকেরও বেশি সময় পর সেই ডারউইনেই ইতিহাস পাল্টে দিল টাইগাররা। অথচ মূল লড়াইয়ে নামার আগে প্রস্তুতি ম্যাচে মাত্র ৫৪ রানে অলআউট হওয়ার দুঃস্মৃতি ছিল সঙ্গী। কিন্তু সেই চাপকে জয় করে, মিচেল স্টার্ক, প্যাট কামিন্স ও জশ হ্যাজলউডদের মতো চারজন ৩০০-এর বেশি টেস্ট উইকেটশিকারি বোলার সমৃদ্ধ অজি লাইনআপের বিপক্ষে এমন রাজসিক জয় সত্যিই অসাধারণ।
গত ১৩ আগস্ট ম্যাচের প্রথম দিনেই জয়ের ভিত গড়ে দেন বাংলাদেশের পেসাররা। তাদের পেস-বুলডোজারে পিষ্ট হয়ে দুইশ রানের আগেই গুটিয়ে যায় অস্ট্রেলিয়ার প্রথম ইনিংস।
এরপর ব্যাট হাতে শাসন করেন বাংলাদেশের ব্যাটাররা। তানজিদ হাসান তামিমের এক ঐতিহাসিক সেঞ্চুরির পাশাপাশি অধিনায়ক নাজমুল হোসেন শান্ত ও মেহেদী হাসান মিরাজের দারুণ দুটি হাফ সেঞ্চুরিতে বড় স্কোরের ভিত পায় দল। টেল এন্ডারদের দৃঢ়তায় প্রথম ইনিংসে বাংলাদেশ ২২৮ রানের বিশাল লিড নেয়, যা বিদেশের মাটিতে প্রথম ইনিংসে বাংলাদেশের ইতিহাসের সর্বোচ্চ লিড।
বিশাল লিডের চাপে পিষ্ট হয়ে দ্বিতীয় ইনিংসে ব্যাট করতে নামে অস্ট্রেলিয়া। এবারও পেসার হাসান জোড়া আঘাতে তাদের গলা চেপে ধরেন। প্রথম ইনিংসে স্টিভ স্মিথের পর দ্বিতীয় ইনিংসে অজিদের হয়ে হাল ধরেন ক্যামেরন গ্রিন। দেশের মাটিতে নিজের প্রথম সেঞ্চুরি তুলে নিয়ে অস্ট্রেলিয়াকে লিড এনে দেন তিনি। কিন্তু এরপরই শুরু হয় মিরাজের ঘূর্ণি জাদু। মিরাজের স্পিন তোপে অস্ট্রেলিয়ার লিড আর বড় হতে পারেনি।
জয়ের জন্য বাংলাদেশের সামনে লক্ষ্য দাঁড়ায় মাত্র ৫৭ রানের। রান তাড়া করতে নেমে প্রথম ইনিংসের সেঞ্চুরিয়ান তানজিদ তামিম শূন্য (ডাক) রানে ফিরে গেলেও কোনো বিপদ ঘটতে দেননি সাদমান ইসলাম ও মুমিনুল হক। অজি বোলারদের আর কোনো সুযোগ না দিয়ে অনায়াসেই জয়ের আনুষ্ঠানিকতা সারেন এই দুই ব্যাটার।
অস্ট্রেলিয়ার জন্য নিজেদের ডেরায় এমন হার হজম করা কঠিন হলেও, বাংলাদেশের জন্য এই অর্জন আগামী বহু বছর ধরে উদযাপনের উপলক্ষ হয়ে থাকবে। ডারউইনের এই বিজয় টেস্ট ক্রিকেটে বাংলাদেশের এক নতুন যুগের সূচনা করল।